রবিবার , ২৮ নভেম্বর ২০২১
সর্বশেষ সংবাদ

পরিবার পরিকল্পনা- ক্রাউনলেস কুইনদের গল্পঃ (১৯৬৫ থেকে ১৯৭৬) পর্ব-এক, ৬ মে ২০২০, populationnewsbd.com

এস.এম জাহাঙ্গীর আলমঃ  সালটা ১৯৯৩ , আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। একদিন সকালে স্কুলে যাবো, ঠিক তার পূর্বে খেতে বসেছি- একটি শব্দ কানে আসলো ! কিন্তু ঝাপসা! প্রচন্ড অট্টহাসিতে আমাদের পাশের এক কৃষক ভাই কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে ছিলেন। মাটি কাটার এক পর্যায়ে ট্যাবলেটের পাতা সদৃশ দুটি পাতা কোদালের আঘাতে উঠে আসে। পাশের জমিতে মাটি কাটতে থাকা মনোরঞ্জন বাবুকে বলছিলেন, ও মনোরঞ্জন দাদা ‘ ইতা তো খালি বাদ কন্ট্রোল’ ( সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়) বা দাদা ! আর কী যে হাসি – এখন ও ঐ শব্দ কানে ভাসে। আমি আমার মা কে জিজ্ঞেস করলাম, মা ‘বাদ কন্ট্রোল’ কি ? মা কোন উত্তর না দিয়ে বললেন বাবা, স্কুলের সময় হয়ে গেছে , তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো। আমি খাওয়া শেষ করে স্কুলে যাওয়ার পথে ঐ দাদা ভাইকে জিজ্ঞেস করি, কী নিয়ে এতো হাসলেন ? বাদ কন্ট্রোল কি ? তখন তিনি ঐ দুটি পাতা দেখালেন আর কী যে হাসি !  উল্লেখ্য যে, আমাদের বাড়ির পেছন দিয়ে একটি বড় খাল বয়ে গেছে, বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পানি বয়ে যায় এদিক দিয়ে। ঐ পানির সাথেই সুখী বড়ির দুটি পাতা ভেসে আসে। আর এগুলো পলি আবৃত থাকায় মাটি কাটার সময় উঠে আসে। অনেক বছর পর অবশ্য আমার আবিষ্কার করতে অসুবিধা হয়নি যে, ঐ দিনকার ‘বাদ কন্ট্রোল’ টি আসলে বার্থ কন্ট্রোল সামগ্রী ছিল! পাঠকদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, আমার এই গল্প বলার রহস্য‌ই বা কি? – অবশ্যই উদ্দেশ্য আছে- চলুন যাই মুল প্রসঙ্গে।-

বাংলাদেশের আজকের উন্নয়নের পেছনে ভূমিকা রেখেছে, এমন কয়েকটি খাতের উল্লেখযোগ্য একটি হলো পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন পরবিার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সমগ্র বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এদেশের প্রধান সমস্যা নিয়ে। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একটি পরিচিত নাম। কিন্তু আজকের এই পর্যায়ে আসতে অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। আজ সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ বিভাগ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আনসাং হিরোদের নিয়ে লিখার দুঃসাহস করেছি । আশা করি ভুলগুলো মার্জনার দৃষ্টিতে দেখবেন। –
বাংলাদেশে ১৯৫০ সালে/ মতান্তরে ১৯৫৩ সালে মেডিকেল স্বেচ্ছাসেবক এবং সমাজকর্মীদের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনার উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু করে। যতটুকু জানা য়ায় মোট ৩(তিন) পর্যায়ে ১৯ জেলাকে কার্যক্রমের আওতায় নেয়া হয়।সর্বশেষ পর্যায়ে কর্মসূচীর আওতায় আনা হয় বৃহত্তর চট্টগ্রাম,পাবনা ও সিলেট জেলাকে (১৯৬৮ সালে)।তৎকালীন সরকারের যুগ্ন সচিব মর্যাদা সম্পন্ন একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান পরিবার পরিকল্পনা বোর্ড গঠন করা হয়। এর প্রধান নির্বাহীর পদবী ছিল ‘সেক্রেটারি’। তাঁর অধীনে বিভিন্ন বিভাগ থেকে বিশেষত স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কিছু সিনিয়র অফিসারকে প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়।অবশ্য জেলা ও থানা অফিসার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য ডিগ্রী প্রাপ্ত যুবকদেরকে সরাসরি নিয়োগ প্রদান করা হয়।বিভাগীয় পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কোন অফিস ছিল না।মূলত কর্মসূচী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল মূখ্য।জেলার কর্মকর্তার পদবী ছিল ই.সি.পি.ও(এক্সিকিউটিভ কাম পাবলিসিটি অফিসার)। তাঁকে প্রশাসনিকভাবে সার্বিক সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার ডেপুটি কমিশনারগণ এবং তাঁরাই ছিলেন জেলা পঃপঃ বোর্ডের সভাপতি। থানা পর্যায়ে থানা পঃপঃ অফিসার ও তদ্বীয় ৩ (তিন) জন টি.এফ.পি.এ ( থানা পরিবার পরিকল্পনা সহকারি)পদধারী কর্মচারী মাঠ পর্যায়ে কর্মসূচী বাস্তবায়নে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।উল্লেখ্য যে, এখনকার মত ইউনিয়ন ও গ্র্রাম পর্যায়ে নিয়মিত কোন কর্মচারী ছিলনা।তবে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে কিছু কিছু সেচ্ছাসেবী পুরুষ ও মহিলা ছিল।পুরুষ সেচ্ছাসেবীদের পদবী ছিল সি.এম.ও এবং মহিলা সেচ্চাসেবীর পদবী ছিল এল.ও। তাদেরকে যথাক্রমে ৩০ ও ১৫ টাকা হারে সম্মানী প্রদান করা হত।কর্মসূচীর সূচনালগ্নে প্রধান কাজ ছিল- মোটিভেশন,প্রচার ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠান করা।অর্থাৎ মূল কাজ ছিল মানুষকে সচেতন করা।উল্লেখ্য যে, তখনকার সময়ে এ কাজের রাস্তা এতোটা মসৃণ ছিলনা।এছাড়া তৎকালীন সময়ে ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম খুবই সীমিত ছিল।শুধু সীমিত আকারে আই.ইউ.সি.ডি(বর্তমান আই.ইউ.ডি) প্রয়োগ করা হত।অবস্থার প্রেক্ষিতে দেশের অনেক স্থানে উপজেলা পর্যায়ের অনেক কর্মচারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘ জনসংখ্যা বিষয়ক এক সমীক্ষায় মন্তব্য করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের শহর ও গ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে পরিবার পরিকল্পনার বাণী পৌছানোর ক্ষেত্রে থানা পর্যায়ের কর্মচারীদের ভুমিকা অনবদ্য এবং ঐ প্রতিবেদনে কর্মচারীদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।এ বিষয়ে মূল্যায়ণ কমিটি তাদের রিপোর্ট পেশ করেন তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী জনাব ফজলুল বারী সমীপে।
স্বাধীনতার পর থেকেই এখানে ব্যাপক হারে জনসংখ্যা বাড়ছিলো। উচ্চ জন্মহার, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি এবং অধিক মৃত্যুহার এখানে বড় ধরনের একটি সমস্য হয়ে দাঁড়ায়! যার ফলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য হয়ে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সমন্বিত কার্যকমে টি.এফ.পি.এ(বর্তমান উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী) পদধারীগণকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত করা হয় এবং মাঠ পর্যায়ে তদারকির দায়িত্ব প্রদান করা হয়। কারণ, তৎকালীন সময়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে উপজেলা পর্যায়ে থানা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং ০৩ (তিন) জন টি.এফ.পি.এ ছাড়া সরকারি কোন জনবল ছিল না এবং এই ০৪ (চার) টি পদ শুরু থেকেই রাজস্বখাতভুক্ত ছিল। তাই এই পদধারীগণকে প্রশিক্ষিত করে দায়িত্ব বন্ঠনই ছিল সরকারের নিকট একমাত্র বিকল্প। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫ সালে এখানে জন্মহার ছিল ৬.৩ ! এক লক্ষ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট এই বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে সাত কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করতো। বিষয়টি সরকারকে ভাবিয়ে তোলে স্বাভাবিকভাবেই। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যোৎপাদনে গুরুত্বারোপ করা হয়। তখনই যাত্রা হয় বহুমুখী ও দেশব্যাপী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। ১৯৭৬ সালের জুনে জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলের সভায় জনসংখ্যাকে দেশের ১ নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ওতোপ্রতোভাবে জড়িত বলে জরুরি গুরুত্ব দেয়া হয়।  আরো অধিকতর মনোযোগ দিতে থাকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের দিকে। কিন্তু জনবল সমস্যার কারণে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হয়! যার ফলে, বিভিন্ন দাতা সংস্থাও এগিয়ে আসে এবং প্রকল্পের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। অবশেষে ১৯৭৬ সালে বর্তমান ‘পরিবার কল্যাণ সহকারি ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ( অবশ্য শুরুতে ভিন্ননামে)’ পদে প্রকল্পভুক্ত একটি বিশাল সংখ্যক মাঠ কর্মচারি নিয়োগ প্রদান করে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারাকে হৃাস করার চেষ্টা করা হয়। এরই মধ্যে সমন্বয় ব্যবস্থা অধিকতর সুচারুভাবে সম্পন্নের জন্য ১৯৭৭ সালে থানা পরিবার পরিকল্পনা অফিসারের অনুপস্থিতিতে সিনিয়র সহকারী (টি.এফ.পি.এ) কে অফিসের দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। আর এভাবেই ১৯৭৬ সন পর্যন্ত এগিয়ে যেতে থাকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। এখানে উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যেখানে টি.এফ.আর ছিলো ৭ (সাত) এর উপরে সেখানে ১৯৭৫ সালে ৬.৩ এ নামিয়ে আনাটাও বিশাল সাফল্য ছিলো সরকারের পক্ষে।
আশা করছি আগামী পর্বে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের পরবর্তী অগ্রগতি অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত আলোচনা করবো । যদি ততোদিন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখেন তবে অবশ্যই আমার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। পরিশেষে বলবো, তথ্যগত কিংবা অন্য কোন অসঙ্গতি কারো চোখে ধরা পড়লে শুধরে দিবেন। অবশ্যই আপনার মতামত শিরোধার্য।
আল্লাহ হাফেজ।
এস এম জাহাঙ্গীর আলম
(লেখক ও কলামিস্ট) 

About admin

This is population NewsBD online newspaper.

Check Also

বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে স্বাস্থ্যখাতে দেশ অনেক এগিয়ে যেতঃ ডা. মোহাম্মদ শরীফ। ৭ মে ২০২০, populationnewsbd.com

ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই আমার প্রানপ্রিয় বন্ধু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  জননেত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
Skip to toolbar