রবিবার , ১৮ এপ্রিল ২০২১
সর্বশেষ সংবাদ

ভাষা দিবস; শাসক ও এলিট শ্রেণির ভুমিকা। আব্দুল গফফার চৌধুরী।

ভাষা দিবসের বয়স ৬৯ বছর হয়ে গেছে। ভাষা দিবস ছিল একটি প্রচণ্ড আন্দোলন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলন আর নেই। আন্দোলনের আবেগ কমে গেছে। ১৯৫৫ সালে বাংলা স্বীকৃতি পেল পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে। দাবি তাই ছিল বাঙালির। রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েই কি সেই দাবি মিটে গেল? না, মেটেনি। দাবি উঠল, ভাষার শুধু স্বীকৃতি নয়; ব্যবহার চাই। জাতীয় জীবনের সর্বত্র চাই ভাষার ব্যবহার।

পাকিস্তানের শাসকরা এ দাবিটি মেটাতে পারেননি। দাবি মেটানোর সময়ও তারা পাননি। ভাষা দিবস তখন এগিয়ে গেছে তার ভূখণ্ডের স্বাধিকার দাবি করে। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা। মুক্ত বাংলার মুক্ত ভাষা হলো বাংলা। কিন্তু জাতীয় জীবনের সব পর্যায়ে তার অবস্থান হলো না। সে ব্যবহারিক ভাষা হয়ে উঠল না। স্বাধীনতার পর ভাষার অনাদর ঘুচল। কিন্তু সমৃদ্ধি ঘটল না। সমৃদ্ধি রইল পণ্ডিতকুলের গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মাঝখানে।


ভাষা যদি জনজীবনের ব্যবহারিক ভাষা না হয় তাহলে তার অস্তিত্ব টেকে না। যেমন সংস্কৃত বা ল্যাটিন ভাষা। তা আজ ধর্মগ্রন্থের ভাষা, মানুষের মুখের ভাষা নয়। বাংলা ভাষার সৌভাগ্য, সে কখনো ধর্মগ্রন্থের ভাষা ছিল না। রাজদরবারের ভাষা ছিল না। ছিল মানুষের মুখের ভাষা। আদি বাংলার নিুশ্রেণির মানুষের মুখের ভাষা। এ শ্রেণিভেদে বাংলা ভাষাও পড়ে গিয়েছিল। সেই ব্রাহ্মণ্যরাজত্বের যুগে অভিজাত শাসকশ্রেণি বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতেন, তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন রৌরব নরকের ভাষা। আদি বাংলায় রচিত পুঁথি তারা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। যারা বাংলায় ধর্মচর্চা করে তাদের তুষের আগুনে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আদি বাংলার শাসকশ্রেণির বাংলা ভাষার প্রতি এ ঘৃণাটা পরবর্তীকালে পাঠান সুলতান ও ইংরেজ আমলে ছিল না। বরং তারা শাসন কার্যের সুবিধার জন্য সাধারণ মানুষের ভাষাবাংলাকে একটু সমাদর করতে শুরু করেন। পাঠান সুলতানদের সহায়তায় বাংলায় রামায়ণ, মহাভারত অনূদিত হয়। ফার্সি সাহিত্যের সংস্পর্শে এসে বাংলায় পুঁথি সাহিত্যের যুগ শুরু হয়। ইংরেজ আমলে খ্রিষ্টান মিশরনারীরা ধর্মপ্রচারের জন্য বাংলা ভাষা ব্যবহার শুরু করেন। বাংলা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা হয়। বাংলায় সংবাদপত্র বেরোয়। ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলায় নাটক, নভেল, সনেট, লিরিক রচনা শুরু হয়। এটাকে বলা হয় বাঙালি ও বাংলা ভাষার রেনেসাঁর যুগ।

ইংরেজ আমলের পর ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হলো, প্রতিষ্ঠিত হলো ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান। তার পূর্বাংশ হলো পূর্ব পাকিস্তান। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা প্রকৃত প্রস্তাবে দখল করে পাঞ্জাবিরা। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অ-পাঞ্জাবি জিন্না। তার সহকারী এবং রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন অ-পাঞ্জাবি লিয়াকত আলী। ভারতের উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা। পাকিস্তানে অ-পাঞ্জাবিদের এ শাসন পাঞ্জাবিরা মেনে নেয়নি। তারা কৌশলে রোগগ্রস্ত জিন্নার মৃত্যু ঘটায় এবং লিয়াকত আলীকে হত্যা করে।

আদি বাংলার ব্রাহ্মণ্য শাসকদের বাংলা ভাষার প্রতি ঘৃণা আবার ফিরিয়ে আনেন পাকিস্তানের এ পাঞ্জাবি শাসকরা। তাদের কাছে বাংলার মুসলমান গণ্য হলো নিন্মবর্ণের মুসলমান। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তারা আখ্যা দিলেন তাদের ধর্মের শত্রু হিন্দুদের ভাষা ও সংস্কৃতি হিসাবে। চাপিয়ে দিতে চাইলেন তাদের মাথায় উর্দুভাষা এবং বাইরের আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি। অন্য ভাষাভাষী মানুষের মাথায় এভাবে শাসকদের ভাষা ও কালচার চাপিয়ে দেওয়া একটি আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা। প্রাচীনকালে আরব সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলাম প্রচারের মুখোশ পরে পারস্য দখল করার পর বিজিত পারসিকদের মাথায় আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। পারসিকরা তা মানেনি। বিদ্রোহ করেছে। যেমন বিদ্রোহ করেছে গত শতকের বায়ান্ন সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তাদের মাথায় তাদের ভাষা-সংস্কৃতির চেয়ে নিুস্তরের ভাষা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার আধিপত্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে।

এই বিদ্রোহের সাফল্য শুধু ভাষার স্বাধীনতা নয়, বাংলা ভাষাভাষী পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করে। বাঙালি স্বাধীন হয়, কিন্তু তাদের নিজেদের শাসকরাও অতীতের ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকে পাওয়া মনোভাব থেকে দীর্ঘকাল মুক্ত হতে পারেননি। দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পরও একটি জাতির দাস মনোভাব থেকে মুক্ত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। বিশেষ করে তাদের অভিজাত শ্রেণির। যারা বিদেশি শাসকদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর আগের প্রভুদের আচার-আচরণ অনুকরণ করতে চান।


বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। বাঙালিরা স্বাধীন হয়েছে, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে বটে, কিন্তু আমাদের শাসক ও এলিট শ্রেণির পরানুকরণ প্রবৃত্তি এখনো দূর হয়নি। প্রাচীন ইংল্যান্ডে কবি চসারের বিদ্রোহের আগে ইংরেজ অভিজাত শ্রেণি যেমন ফরাসি ভাষা ও ফরাসি সংস্কৃতির আধিপত্য স্বেচ্ছায় বহন করেছে, বাংলাদেশেও তেমনি বাঙালি শাসক ও এলিট শ্রেণি প্রথমে পাকিস্তানি রীতিনীতি, পরে বিশ্বায়নের নামে হিন্দি অপসংস্কৃতির বোঝা বহন করছেন।

স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষার যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়নি, তা নয়। অবশ্যই হয়েছে। তা বাংলা একাডেমির গবেষণাগারের পরিশ্রমনিঃসৃত উন্নয়ন। কোনো স্বাভাবিক, সামাজিক জীবনের সর্বস্তরের ব্যবহার-উপযোগী উন্নয়ন হয়নি। আমাদের শাসকরা বিদেশে গিয়ে অশুদ্ধ বিদেশি ভাষায় কথা বলে গর্ব অনুভব করেন। তবু বিশুদ্ধ বাংলা বলতে চান না। অথচ বাংলাকে তারা রাষ্ট্রভাষা করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের ব্যবহারিক কাজে ভাষার উপস্থিতি নেই। জনগণকে প্রতারিত করার জন্য বাংলাকে তারা রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থার নিন্মস্তরে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করেছেন। উচ্চশিক্ষার কতিপয় ক্ষেত্রেও করেছেন। কিন্তু এ শিক্ষা কারা পায়? পায় সাধারণ মানুষ। অসাধারণ অর্থাৎ অভিজাত ও শাসক শ্রেণির সন্তানেরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে যায় বিদেশি ভাষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের আভিজাত্যের কৌলীন্য ও আধিপত্য রক্ষার জন্য।

শুনেছি, শেরেবাংলা ফজলুল হকও নিজের ঘরে উর্দু বলতেন। আইন পরিষদে গেলে দারুণ ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ মানুষের কাছে গেলে খাঁটি গ্রাম্য বাংলায়, এমনকি বরিশালের বাংলায় দারুণ আবেগঘন বক্তৃতা দিতেন। ভাষার এ শ্রেণিবিন্যাস বাংলাদেশের বর্তমান শাসককুলের মধ্যেও রয়েছে। এটা ভাঙতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জাতিসংঘে গিয়েও বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। চীনের সাবেক কুও মিংটাং সরকারের প্রধান জেনারেল চিয়াং কাইশেক দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন দিল্লি ও কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি চমৎকার ইংরেজি জানতেন। কিন্তু বিদেশে এসে কথা বলার সময় একটি ইংরেজি বলেননি। চীনা ভাষায় সাংবাদিক সভা করেছেন। দোভাষী তার বক্তৃতার ইংরেজি তরজমা করেছে। জাতীয় মর্যাদার সঙ্গে ভাষার মর্যাদাকে চীনের সরকার ও মানুষ এখনো একই অবস্থানে রাখে।

আমরা ভাষা দিবস পালন করি। সেটি এখন সরকারি অনুষ্ঠান। জনসম্পৃক্ত আন্দোলন নয়। আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করেছি। কিছু কিছু মর্যাদা দিয়েছিও মানুষকে ভোলাবার জন্য। কিন্তু ভাষার মর্যাদাকে এখনো রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সমন্বিত করতে পারিনি। বাংলা যেন বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির ভাষা। প্রথম শ্রেণির ভাষা নয়। সেখানে মাথা জাঁকিয়ে বসে আছে ইংরেজি ভাষা। এখন সেখানে হিন্দি অপসংস্কৃতির ছাপ দেখা যায়।

আমরা ইংরেজি শিখব। অবশ্যই শিখব। কারণ ইংরেজি না শিখলে পশ্চিমের আধুনিকতার দরজা, নবপ্রযুক্তির দরজা আমাদের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলাকে বিজ্ঞানের ভাষা, ব্যবহারিক ও ভাষা হিসাবে সমৃদ্ধ করে তুলতে হবে। এখন পর্যন্ত বাংলা একটি উন্নত সাহিত্যের ভাষা। বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক জীবনের ভাষা নয়। হিন্দু সম্প্রদায় যেমন গঙ্গা জল ঘটিতে করে ঘরে তুলে রাখে, কেবল পূজার জন্য; আমরা তেমনি বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করে ঘটিতে তুলে রেখেছি, ভাষা দিবস, নববর্ষ উৎসবে ব্যবহারের জন্য।

আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনে বাংলা ভাষা ব্যবহার্য নয়। ৫০ বছর হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা বাংলায় একটি ওষুধের প্রেসক্রিপশন লিখতে পারি না, একটি কমার্সিয়াল চিঠি লিখতে পারি না। আমাদের কূটনীতিকরা বাংলায় কূটনৈতিক চিঠি লিখতে ভয় পান অথবা অক্ষম। বাংলায় সর্বাধিক লেখা হয় প্রেমপত্র, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান উদ্ধৃত করে। আমাদের ব্যর্থতা ও অক্ষমতা এখানেই যে, বাংলাকে অত্যন্ত উন্নত সাহিত্যের ভাষা করেই আমরা তৃপ্ত। তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষা, ব্যবহারিক ভাষা করার দিকে নজর তেমন দেইনি। কেবল অনুবাদ দিয়ে কোনো ভাষাকে সমৃদ্ধ করা যায় না। বাংলা ভাষাকেও করা যাবে না। বাংলা ভাষার গ্রহণী শক্তি অনেক। সে পৃথিবীর সব ভাষা থেকে শব্দ আহরণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ভাষা থেকে কেন পারবে না?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অসাম্প্রদায়িক বাংলা ভাষাকে তার অসাম্প্রদায়িক জাতি রাষ্ট্রের ভিত্তি করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন ভাষার বিকাশ। একজন সাফারি শার্ট পরা, কোনো চশমা পরা পাকিস্তানের ট্রেনিংপ্রাপ্ত সেনাপতি এসে ক্ষমতা দখল করার পর সেই ভিত্তি ভেঙে দিলেন। শুধু রাজনীতি নয়, সমাজ, সংস্কৃতি এবং ভাষার উপরেও ছাপ মারলেন সাম্প্রদায়িকতার, ধর্মান্ধতার। মধ্যযুগের অন্ধকারের দিকে মুখ ফেরাতে চাইলেন দেশের। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’

স্বৈরাচারী শাসনের অবসান, ধর্মান্ধদের শাসনের অবসান হয়েছে। দেশ অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে শনৈঃ শনৈঃ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দেশকে সেই উটের পিঠ থেকে নামানো যায়নি। বরং আমাদের বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসকরাও এই উটের পিঠে চড়ার জন্য আগ্রহী। তাহলে আমাদের আশা কোথায়? আমাদের তরুণ প্রজন্ম ? তাদেরও একাংশ তো বিভ্রান্ত এবং বিপথগামী। তাহলে ঊনসত্তর বছর বয়সের ভাষা দিবস আমাদের কি আশার বাণী শোনাবে? আমি নৈরাশ্যবাদী নই। বিশ্বাস করি বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামের আগুন নিভে গেলেও একেবারে ছাই হয়ে যায়নি। এই ভস্ম থেকেই হয়তো স্ফিংসের মতো একদিন আশায় পাখি ডানা মেলবে।

About admin

Check Also

তাহলে কি চীনের উত্থান এবং যুক্তরাস্ট্রের পতন অনিবার্য্য ? এস এম জাহাঙ্গীর, ৯ মে ২০২০, populationnewsbd.com

করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা অনুধাবন করা এখন‌ই হয়তো কঠিন। তবে গত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Skip to toolbar