বৃহস্পতিবার , ২৪ জুন ২০২১
সর্বশেষ সংবাদ

সামাজিক প্রথার নামে অমানবিক নির্যাতনের শেষ কোথায় ? ৯ মে ২০২১

সানজিদা ইয়াসমিন লিজা: সিলেট অঞ্চলের সামাজিক রীতিনীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সবকিছুতেই স্বকীয়তা বিদ্যমান। রমজান মাসকে উপলক্ষ করে এখানে যে প্রথা ব্যাপক প্রচলিত, সেটা হচ্ছে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের বাবা কর্তৃক পাঠানো ইফতার সামগ্রী। রীতি অনুযায়ী এক রমজানে মাসে তিনবার ইফতারি দিতে হয়। প্রথম ইফতারি প্রথম রমজানে, দ্বিতীয় ইফতারি ২০ রমজানের ভেতরে, আর শেষের ইফতারি ৩০ রমজানের আগে। প্রথম ইফতারিতে মোটামুটি পরিসরে ইফতারি দিলেই চলে, তবে দ্বিতীয়বার ইফতারি অনেক বড় করে দিতে হয়। আর সর্বশেষ ইফাতারি সামগ্রীর সঙ্গে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে কাপড় দিতে হয় এবং এসব নিয়ে গিয়ে সবাইকে ঈদের দাওয়াত দিতে হয়, তা না হলে আবার ঈদের দাওয়াত মঞ্জুর হয় না, মানে ধরে নেয়া হয়, ঈদের দাওয়াত ঠিকঠাক দেয়া হয়নি।

আরেকটা বিষয় প্রথম ইফতারি দেয়ার দিন নিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন মাথা না ঘামালেও দ্বিতীয় ইফতারি দেয়ার দিন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। কারণ তাদের ভাষ্যমতে, ২০ রমজানে ইফতারি দিলে বিষ হয়ে যায়, সেজন্য এর আগেই দেয়া বাঞ্ছনীয়।

ইফতারি সামগ্রী মেয়ের শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে গিয়ে মেয়ের বাবা-ভাইদের কী পরিমাণ ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়, সেটা তারাই বুঝবেন যারা এর কঠিন বাস্তবতার শিকার। কভিডকালে সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া এমন কোনো পরিবার পাওয়া দুষ্কর হবে, যারা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা টানাটানিতে পড়েনি। এই অবস্থার মধ্যেও মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে ভালো রাখতে এবং খোটা ও বাঁকা কথা থেকে রক্ষায় সবার বাবাই সামর্থ্যমতো ইফতারি সামগ্রি মেয়ের শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে কার্পণ্য করেন না। তাও যদি ইফতারি শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মনমতো না হয়, তাহলে একথা-সেকথা বলে বৌকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে একটু পিছপা হন না কেউ!

যদি কারও সামর্থ্য থাকে ইচ্ছামতো বিলাসিতা করতে পারে অর্থ খরচ করতে, তা সেটা যেকোনো উপায় অবলম্বন করে। যদি এমন হয়, কারও সামর্থ্য আছে এবং খুশি হয়ে তার মেয়ের বাড়িতে যদি প্রতিদিনই ইফতারি কিংবা মূল্যবান উপহার সামগ্রী পাঠায়, তাতে কারও কিছু যায়-আসে না। তবে সমাজের মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর জন্য এসব দেয়া-নেয়াকে অবশ্য কর্তব্যে পরিণত করা অমার্জনীয় নয় কি? রমজানে এমন অহরহ দেখা যাচ্ছে, মা-বাবার সামর্থ্য না থাকলেও ধার-কর্জ করে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতারি সামগ্রী পাঠানো। এর উদ্দেশ্য মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ভালো থাকুক, অপমানিত যেন না হয়।

অপমান থেকে নিজে ও নিজের মেয়েকে বাঁচাতে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির আবদার সবার আগে পূরণ করেন মা-বাবা। ধিক্কার জানাই এমন সমাজ ও সমাজপতিদের, যারা এ অমানবিক রীতির প্রচলন করে গেছেন।

কিছু হƒদয়বিদারক কাহিনিও আছে। বাবা নেই, মা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, নিজে দু’বেলা ঠিকমতো খেতে পারেন না, দিন আনেন দিন খান অবস্থা। দুঃখজনকভাবে সত্য হলো, এসব হতদরিদ্র মানুষের জন্যও সমান রীতি। ইফতারি সামগ্রী এমন কোনো মহামূল্যবান নয়, যা না হলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।

শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালে এই সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান করা সম্ভব। অনেক ছেলে আছে, শ্বশুরবাড়ি থেকে এসব সামগ্রী নিতে তাদের ব্যক্তিত্বে বাধে, তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের চাপে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

বাবার বাড়ি থেকে বিভিন্ন জিনিস এলেই শ্বশুরবাড়িতে যদি বউয়ের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে তো বউকে নয়, মূল্যায়ন করা হচ্ছে বউয়ের বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া উপঢৌকন সামগ্রীর। যার বাবার বাড়ি থেকে যত বেশি আনা যাবে, শ্বশুরবাড়িতে তার প্রভাব বাড়বে। তিনি অন্য বউদের ওপর কর্তৃত্ব খাটাতে পারবেন, পরিবারের সদস্যরা যত্নশীল থাকবেন তার প্রতি। অন্য বউয়েরা কিঞ্চিৎ হলেও অবহেলার শিকার হবেন।

আমাদের মূল্যবোধ আদৌ আছে কি না, নিজেরাও জানি না। বছরের পর বছর নীরবে এই অমানবিক প্রথাকে শিক্ষিত ভদ্র সমাজ কীভাবে সমর্থন করতে পারে। আমাদের বিবেক ও নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করার সময় এখনই। যারা এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। পরিবর্তন এক দিনে সম্ভব নয়। তাই বলে সচেতন নাগরিক হাত-পা গুটিয়ে থাকতে পারে না। আমাদের প্রত্যেককে নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে, পরিবারকে সচেতন করতে হবে। কন্যাদায়গ্রস্ত মা-বাবাকে স্বস্তি দিতে আমরা কি এতটুকু করতে পারি না? মেয়েরা ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকুক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

About admin

This is population NewsBD online newspaper.

Check Also

আইসিসি চেয়ারম্যান পদে পাক-ভারত লড়াই? ১১ জুন ২০২০, populationnewsbd.com

ক্রীড়া ডেস্কঃ ক্রিকেট মাঠে ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক লড়াই বন্ধ দীর্ঘদিন ধরে। তবে ক্রিকেট রাজনীতির মাঠে চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Skip to toolbar